,

Home » Top » ভালো আছি, ভালো থেকো.

ভালো আছি, ভালো থেকো.

 

.০৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১২:১৬:০৮
কেয়ামত থেকে কেয়ামত ছবির মাধ্যমে এ দেশের সিনেমা জগতে আবির্ভাব ঘটেছিল এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের। যিনি তার মনোমুগ্ধকর অভিনয় দেখিয়ে অল্পসময়ে বাংলা সিনেমাপ্রেমী দর্শকদের হৃদয়ে স্থান করে নিতে সক্ষম হন। একের পর এক সুপার হিট সিনেমা উপহার দিয়ে তিনি সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আর কেউ নন কোটি ভক্তের নায়ক সালমান শাহ্।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের দুঃসময়ে সুদর্শন স্টাইলিস্ট আধুনিক মানসিকতার এই মহানায়কের আগমন ঘটে।

১৯৯৩ সালের ২৫ মার্চ সময়ে পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবিতে অভিনয় করলেন নবাগত এক নায়ক। ছবিটি নিয়ে প্রথমে নকলের অভিযোগ উঠলেও পরবর্তীতে দর্শক মুগ্ধ হয় নবাগত নায়কটির অভিনয়ে। দর্শক ছবিটি দেখল আর মন্ত্রমুগ্ধের মত আবিষ্কার করল এক নবাগত নায়কের অসাধারণ অভিনয়শৈলী।

চলচ্চিত্রপ্রেমীরা হলমুখী হলো, পরিচালকরাও আশ্বস্ত হলেন, সুদিন ফিরে এসেছিল বাংলা চলচ্চিত্রের। এরপর থেকে বাংলা চলচ্চিত্রে উপহার দিতে থাকলেন একে একে দুর্দান্ত ২৭টি ছবি। তার অভিনীত ৯৫ ভাগ চলচ্চিত্র সুপারহিট এবং ব্যবসা সফল হয়। ঠিক যেন রূপকথার রাজপুত্র।

এলেন, অভিনয়ের যাদু দেখালেন, আবার সবার মন জয় করে কাউকে কিছু না বলে না ফেরার দেশে চলেও গেলেন। হাজার হাজার ভক্তদের কাঁদিয়ে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থামিয়ে দিলেন তার জীবনরথ।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সর্বকালের আলোচিত ও সুদর্শন নায়ক সালমান শাহ। সালমান শাহের আসল নাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরী। দুই ভাইয়ের মধ্যে সালমানই বড়। ১৯৭০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটে তার নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছোটবেলা থেকে পড়ালেখার পাশাপাশি মডেলিং ও অভিনয়ের প্রতি তার দুর্বলতা ছিল। চলচ্চিত্রে আসার আগে মডেলিং করেছেন এবং ছোটপর্দার একাধিক নাটকে অভিনয়ও করেছেন।

বাংলা সিনেমা যখন ‘জাফর ইকবালের’ মৃত্যুর পর সত্যিকারের একজন সুদর্শন নায়কের খরায় ভুগছিল তখনই সালমান শাহ আবির্ভূত হলেন। নবাগত নায়িকা মৌসুমীর সঙ্গে প্রথম ছবিতে জুটি বাঁধলেও পরবর্তীতে শাবনূরের সঙ্গে জুটি গড়ে একের পর এক ব্যবসা সফল ছবি উপহার দেন সালমান।

১৯৯৩ সালের ২৫ মার্চ তার প্রথম ছবি ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ মুক্তির পর মাত্র ৪ বছরের মধ্যেই ২৭টি ছবি করে ফেলেন। ১৯৮৬ সালের দিকে হানিফ সংকেতের গ্রন্থনায় কথার কথা নামে একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান প্রচারিত হত। এর কোন একটি পর্বে ‘নামটি ছিল তার অপূর্ব’ নামের একটি গানের মিউজিক ভিডিও পরিবেশিত হয়। হানিফ সংকেতের স্বকন্ঠে গাওয়া এই গান এবং মিউজিক ভিডিও দুটোই অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত।

একজন সম্ভাবনাময় সদ্য তরুণ তার পরিবারের নানারকমের ঝামেলার কারণে মাদকাসক্ত হয়ে মারা যায়, এই ছিল গানটির থিম। গানের প্রধান চরিত্র অপূর্বর ভূমিকায় অভিনয়ের মাধ্যমেই সালমান শাহ মিডিয়াতে প্রথম আলোচিত হন। তখন অবশ্য তিনি ইমন নামেই পরিচিত ছিলেন। মিউজিক ভিডিওটি জনপ্রিয়তা পেলেও নিয়মিত টিভিতে না আসার কারণে দর্শক আস্তে আস্তে ইমনকে ভুলে যায়। আরও কয়েক বছর পর অবশ্য তিনি আব্দুল্লাহ আল মামুনের প্রযোজনায় ‘পাথর সময়’ নাটকে একটি ছোট চরিত্রে এবং কয়েকটি বিজ্ঞাপনচিত্রেও কাজ করেছিলেন।

১৯৯৩ সালের ২৫শে মার্চ। ঈদুল ফিতর। হিন্দি কেয়ামত সে কেয়ামত তক ছবির কপিরাইট বৈধভাবে কিনে আনন্দমেলা সিনেমা লিমিটেড পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানকে দিয়ে তৈরি করে কেয়ামত থেকে কেয়ামত। সে সময়কার জনপ্রিয় মডেল আনন্দ বিচিত্রা সুন্দরী মৌসুমীর সাথে অভিনয় করেন অপেক্ষাকৃত স্বল্প পরিচিত ইমন। প্রযোজকগোষ্ঠি অবশ্য ততদিনে পারিবারিক নামকে একটু কাটছাট করে তার পর্দা নাম ঠিক করেছেন সালমান শাহ।

সালমান সম্বন্ধে শুধু এটুকু বলা যায়, বাংলাদেশি বাংলা ছবির প্রায় ৫০ বছরের ইতিহাসে সেই প্রাচীন আমলে রহমান এবং নায়করাজ রাজ্জাকের পর সালমানই একমাত্র নায়ক যিনি সর্বমহলে তার গ্রহনযোগ্যতা তৈরি করতে এবং তরুণদের স্টাইল আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন। বাংলা ছবির নায়কদের মধ্যে সালমান ছাড়া অন্য কারো ফ্যাশন, স্টাইল লোকে তার আগে বা পরে কখনোই অনুসরণ করেনি। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি হয়ত অনভ্যাস, সিনেমা হলের পরিবেশ এবং তার অভিনীত ছবিগুলির মানের কারণে হলে যায়নি, কিন্তু নায়ক হিসেবে সালমানকে বরণ করে নিয়েছিল। মাত্র সাড়ে তিন থেকে চার বছরের ক্যারিয়ারে সালমান শাহ নিজেকে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন তা আগামীতে ঢালিউডে কেউ স্পর্শ করতে পারবেন কিনা তাতে সন্দেহ রয়েছে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল নায়িকা মৌসুমীর সঙ্গে জুটি বেঁধে নতুন করে চলচ্চিত্র নির্মাতা-প্রযোজককে তিনিই আশার আলো দেখান। সালমান-মৌসুমী জুটি ভেঙে গেলেও সালমান শাহের জনপ্রিয়তা মোটেও ম্লান হয়নি। বরং তার পাশে এসে একাধিক নবীন নায়িকা জ্বলে ওঠেছেন। তাদেরই একজন আজকের সুপারস্টার শাবনূর।

১৯৯৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাতে পরিচালক মতিন রহমানের সাথে দেখা হবার পর সালমান তাকে বলেছিলেন, ‘বাবা, আমি ভালো হয়ে গেছি। আগামীকাল থেকে আর কাউকে কষ্ট দিবো না। তোমাদের চেষ্টায় আজ আমি ইমন থেকে সালমান। আগামীকালের সকাল হবে সবার জন্য প্রিয় সকাল।’

৬ সেপ্টেম্বর সকালে সালমান কে পাওয়া যায় তার রুমের সিলিংয়ে ঝুলন্ত অবস্থায়। প্রিয় নায়কের মৃত্যুশোক সহ্য করতে না পেরে বেশ ক’জন ভক্ত আত্মহত্যা করেন। কিন্তু সালমান শাহ-এর পরিবারের সদস্যরা বিশেষ করে মা নীলা চৌধুরী কিছুতেই তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে মেনে নেননি। সালমান শাহ-এর মৃত্যুকে ঘিরে জন্ম হয় নানা প্রশ্নের। এক অবাঙালি ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর সঙ্গে স্ত্রী সামিরার সম্পর্কের জেরে সালমান খুন হয়েছেন এমন অভিযোগ ওঠে। সালমান যে ব্র্যান্ডের সিগারেট খেতেন সেটি ছাড়া অন্য একটি ব্র্যান্ডের সিগারেট তার ঘরে পাওয়া যায়। প্রতিবেশীদের কয়েকজন তার ফ্ল্যাট থেকে ধস্তাধস্তির শব্দ পাওয়ার কথাও বলেন। সালমান শাহ-এর মৃত্যুকে ঘিরে রহস্য সমাধানের দাবি এখনও জানিয়ে চলেছেন তার ভক্তরা।

সালমান শাহর মৃত্যুর এত বছর পরো তার জন্য ভক্তদের ভালোবাসা এতটুকু ম্লান হয়নি। একজন সালমান ভক্ত হিসেবে শুধু একটাই শুভকামনা- ভালো আছি, ভালো থেকো…

Leave a Reply