,

Home » সম্পাদকীয় » যেই ভাষণ আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের দলিল

যেই ভাষণ আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের দলিল

আজ ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ। এই দিনে শুধু আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি তাত্পর্যপূর্ণ মাইলফলকই রচিত হয় নাই, সেই সাথে বাঙালির ইতিহাসেও যোগ হইয়াছিল অসামান্য এক সম্পদ। সেইটি হইল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রদত্ত ভাষণ। জাতির জীবনের এক মহাক্রান্তিলগ্নে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসমুদ্রে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ ভাষণটি দিয়াছিলেন। ইউনেস্কো যাহা সম্প্রতি অনুধাবন করিয়াছে, বাংলার মুক্তিকামী মানুষ বলিতে গেলে তাত্ক্ষণিকভাবেই এই ভাষণের গুরুত্ব উপলব্ধি করিতে সক্ষম হইয়াছিল। সকলেই জানেন, বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে পাকিস্তানি হানাদারকবলিত চরম অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনগুলিতে এই ভাষণই তাহাদের সাহস জোগাইয়াছে, দেখাইয়াছে স্বাধীনতার পথ। এই ভাষণের মন্ত্রে উজ্জীবিত হইয়াই বাংলার দামাল ছেলেরা দলে দলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিল। যত্সামান্য প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম লইয়া মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছিল পাকিস্তানি দুর্র্ধষ হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। বস্তুত বঙ্গবন্ধু ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক আর তাঁহার এই ভাষণটি ছিল সঞ্জীবনী মন্ত্র।
ইউনেস্কোর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির বহু আগে হইতেই এই ভাষণটি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসাবে বিবেচিত হইয়া আসিতেছে। কারণ এই ভাষণের উপর নির্ভর করিতেছিল একটি জাতির ভবিষ্যত্। বঙ্গবন্ধুর নিজের জন্যও ইহা ছিল তাহার জীবনের কঠিনতম অগ্নিপরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় অভাবনীয় সাফল্যের সহিত উত্তীর্ণ হইতে পারিয়াছিলেন বলিয়াই বাংলাদেশ আজ স্বাধীন এবং তিনি আমাদের জাতির পিতা। মনে রাখা আবশ্যক যে, তখন তাহার সম্মুখে ছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের উত্তাল জনসমুদ্র। আর সারাদেশে অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ ছিল আরও কয়েক কোটি মানুষ। সকলেই তাহাদের প্রিয় নেতার নিকট হইতে যেই শব্দটি শুনিতে চাহে তাহা হইল—স্বাধীনতা। অন্যদিকে পাকিস্তানি জান্তার শ্যেনদৃষ্টিও ছিল তাহার উপর। একটু এদিক-ওদিক হইলেই বিচ্ছিন্নতাবাদে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহিতার খড়্গ নামিয়া আসিবে তাহার উপর। এমন একটি রুদ্ধশ্বাস অবস্থার মধ্যেও মাত্র ১৮ মিনিটের ভাষণে সবই বলিয়াছেন তিনি। দিয়াছেন স্বাধীনতার পথনির্দেশনাও। কিন্তু সবই করিয়াছেন পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের আইনি বাধ্যবাধকতার সীমা লঙ্ঘন না করিয়াই। তবে ইহা ভাষণটির বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনার একটি দিক মাত্র।
ঢাকায় নিযুক্ত ইউনেস্কোর কান্ট্রি ডিরেক্টর বিট্রিচ কালদুল বলিয়াছেন যে, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য দলিল বা ‘ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ হিসাবে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ যুক্ত করিতে পারিয়া ইউনেস্কো গর্বিত। কারণ সংস্থাটির মতে, একটি ভাষণের মাধ্যমে একটি জাতিকে একত্রিত করার অনন্য এক ইতিহাসের দলিল এইটি। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সহিত ইহা যুক্ত। সংগত কারণেই ভাষণটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম বলিয়া তাহারা মনে করে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হইল, এই গর্বের ধনটিকেও বিতর্কিত করিবার অপচেষ্টা হইয়াছে নানাভাবে। এমনকি সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ক্ষমতা জবরদখলকারীরা সরকারি গণমাধ্যমে ভাষণটি প্রচারের উপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করিয়াছিল। নানা কূটকৌশলে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছিল বাঙালির ইতিহাসের অতি গুরুত্বপূর্ণ এই অধ্যায়টিকে। কিন্তু সত্যের এমনই মহিমা যে সেই ভাষণটিই এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে স্বীকৃত হইয়াছে।

Leave a Reply